জমির নামজারিতে নতুন যেসব পরিবর্তন এনেছে ভূমি মন্ত্রণালয়

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি নামজারি করতে গিয়ে অনেকেই বণ্টননামা, ওয়ারিশ সনদ কিংবা প্রত্যেক ওয়ারিশের নাম অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন। বিশেষ করে একজন ওয়ারিশের নামে পুরো জমি নামজারি করার চেষ্টা বা বণ্টননামা না থাকায় যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল করার মতো সমস্যাও দেখা গেছে।

এই বিষয়টি পরিষ্কার করতে ভূমি মন্ত্রণালয় উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমি বা স্থাবর সম্পত্তির নামজারি নিয়ে একটি স্পষ্টীকরণ জারি করেছে। প্রকাশিত নোটিশে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

উত্তরাধিকারসূত্রে জমির নামজারিতে কী পরিবর্তন এসেছে?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা মূলত দুইভাবে নামজারি করতে পারবেন—

  1. সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি
  2. বণ্টননামার ভিত্তিতে পৃথক পৃথক খতিয়ান তৈরি করে নামজারি

এই দুই প্রক্রিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।


১. সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করা যাবে

মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ওয়ারিশ চাইলে একসঙ্গে নামজারির আবেদন করতে পারবেন।

এক্ষেত্রে প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করে একটি যৌথ নামজারি খতিয়ান তৈরি করা যাবে। এর জন্য আলাদা বণ্টননামা দলিল থাকা বাধ্যতামূলক নয়।

অর্থাৎ, ধরুন কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর ৩ জন ওয়ারিশ রয়েছেন। তাঁরা যদি জমি ভাগ না করে যৌথ মালিকানা হিসেবে রেকর্ড রাখতে চান, তাহলে তিনজনের নাম ও তাঁদের আইনানুগ হিস্যা উল্লেখ করে যৌথ নামজারি করা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে কী লাগবে?

উত্তরাধিকারসূত্রে নামজারির আবেদনে সাধারণত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে থাকতে পারে—

  • ওয়ারিশ সনদ
  • সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের কপি
  • সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা
  • আবেদনকারীদের পরিচয়পত্র
  • প্রয়োজনীয় অন্যান্য দলিল বা প্রমাণক

সরকারি ই-মিউটেশন নির্দেশিকাতেও উত্তরাধিকারসূত্রে মিউটেশনের ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ, খতিয়ানের কপি এবং প্রযোজ্য অন্যান্য নথি সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।


২. বণ্টননামা না থাকলেও যৌথ নামজারি বাতিল করা যাবে না

ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্টীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শুধু বণ্টননামা দলিল নেই, এই কারণে সব ওয়ারিশের যৌথভাবে করা নামজারি আবেদন নামঞ্জুর করা উচিত নয়।

যদি ওয়ারিশরা যৌথভাবে নামজারি করতে চান এবং ওয়ারিশ সনদের ভিত্তিতে প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করা যায়, তাহলে বণ্টননামা ছাড়াও যৌথ খতিয়ান করা যেতে পারে।

এতে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কাউকে বাদ দিয়ে এককভাবে পুরো সম্পত্তি নিজের নামে রেকর্ড করার প্রবণতা কমবে এবং সরকারি রেকর্ডে প্রকৃত ওয়ারিশদের হিস্যা প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ বাড়বে।


আলাদা আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে কী হবে?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

ওয়ারিশরা যদি শুধু যৌথভাবে মালিক হিসেবে রেকর্ড রাখতে না চান, বরং কে কোন দাগে বা জমির কোন অংশে ভোগ-দখল করবেন তা নির্ধারণ করে পৃথক পৃথক খতিয়ান করতে চান, তাহলে বণ্টননামা প্রয়োজন হবে।

এক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের সম্মতিতে আপস বণ্টননামা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এরপর সেই বণ্টননামার ভিত্তিতে পৃথক নামজারির আবেদন করা যাবে।

সহজভাবে বুঝুন

বণ্টননামা ছাড়া:

সব ওয়ারিশের নাম + প্রত্যেকের হিস্যা = যৌথ খতিয়ান

বণ্টননামাসহ:

কে কোন জমি/দাগের অংশ পাবেন = পৃথক খতিয়ান

অর্থাৎ, যৌথ নামজারি এবং জমাভাগ করে পৃথক নামজারি এক বিষয় নয়।


একটি উদাহরণ

ধরা যাক, রহিম সাহেব মৃত্যুর সময় ১২ শতক জমি রেখে গেছেন। তাঁর ৩ জন বৈধ ওয়ারিশ রয়েছেন।

ওয়ারিশরা যদি সিদ্ধান্ত নেন যে ১২ শতক জমি যৌথ মালিকানায় থাকবে, তাহলে ওয়ারিশ সনদের ভিত্তিতে প্রত্যেকের আইনানুগ হিস্যা উল্লেখ করে যৌথ নামজারি করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বণ্টননামা বাধ্যতামূলক নয়।

কিন্তু যদি তিনজনের মধ্যে একজন ৪ শতক, অন্যজন ৩ শতক এবং অন্যজন ৫ শতক জমির নির্দিষ্ট অংশ আলাদাভাবে নিজের নামে খতিয়ান করতে চান, তাহলে জমির ভাগ নির্ধারণ করে রেজিস্টার্ড বণ্টননামা করতে হবে এবং তার ভিত্তিতে পৃথক খতিয়ান তৈরির জন্য নামজারি করতে হবে।


ওয়ারিশ সনদের গুরুত্ব কী?

উত্তরাধিকারসূত্রে নামজারির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রমাণক। সরকারি মিউটেশন নির্দেশিকায় উত্তরাধিকারসূত্রে মিউটেশনের আবেদনের সঙ্গে ওয়ারিশ সনদপত্র সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

সাধারণভাবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যেমন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কমিশনারের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করে আবেদন করা হয়।

ওয়ারিশ সনদে কোনো বৈধ ওয়ারিশ বাদ পড়েছে কি না, আবেদন করার আগে তা ভালোভাবে যাচাই করা উচিত।


নামজারির আবেদন কীভাবে করবেন?

বর্তমানে ভূমি সেবার অনেক কার্যক্রম অনলাইনে করা যায়। সরকারি ভূমি পোর্টালেও অনলাইনে ভূমি সেবা, নামজারি এবং অন্যান্য ভূমি-সংক্রান্ত সেবা পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

উত্তরাধিকারসূত্রে নামজারির ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ধাপগুলো হলো—

ধাপ ১: ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ

প্রথমে মৃত ব্যক্তির বৈধ ওয়ারিশদের সঠিক তালিকা নিশ্চিত করে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করুন।

ধাপ ২: জমির রেকর্ড যাচাই

মৃত ব্যক্তির নামে থাকা খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং অন্যান্য রেকর্ড যাচাই করুন।

ধাপ ৩: নামজারির ধরন নির্ধারণ

ওয়ারিশরা সিদ্ধান্ত নিন—

  • যৌথ খতিয়ান করবেন, নাকি
  • বণ্টন করে পৃথক খতিয়ান করবেন।

ধাপ ৪: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করুন

ওয়ারিশ সনদ, খতিয়ানের কপি, পরিচয়পত্র, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য নথি প্রস্তুত করুন। সরকারি মিউটেশন সিস্টেমেও এসব প্রমাণক সংযুক্ত করার নির্দেশনা রয়েছে।

ধাপ ৫: অনলাইনে আবেদন করুন

প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনে মিউটেশন আবেদন করা যায়। আবেদন যাচাই, নোটিশ, শুনানি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমের পর নামজারি অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।


নতুন নিয়মের ফলে সাধারণ মানুষের কী সুবিধা হবে?

এই নির্দেশনার ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির রেকর্ড করার ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি হয়েছে।

১. একজন ওয়ারিশ অন্যদের বাদ দিতে পারবেন না

সব বৈধ ওয়ারিশের হিস্যা রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ থাকায় একজনের নামে পুরো সম্পত্তি নামজারি করার ঝুঁকি কমবে।

২. যৌথ নামজারি সহজ হয়েছে

শুধু যৌথ খতিয়ান করার জন্য আলাদা বণ্টননামা করার প্রয়োজন নেই।

৩. অযথা আবেদন বাতিলের সুযোগ কমবে

শুধু বণ্টননামা নেই এই কারণে সব ওয়ারিশের যৌথ নামজারি আবেদন বাতিল করা উচিত নয়।

৪. পৃথক মালিকানা চাইলে প্রক্রিয়াটি পরিষ্কার

কে কোন অংশ পাবেন তা নির্ধারণ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে বণ্টননামা করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করা হয়েছে।


জমির নামজারি করতে গিয়ে নিচের বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকুন—

  • কোনো বৈধ ওয়ারিশকে বাদ দেবেন না।
  • ওয়ারিশ সনদের তথ্য সঠিক কি না যাচাই করুন।
  • মৃত ব্যক্তির জমির মোট পরিমাণ ও খতিয়ান যাচাই করুন।
  • দাগ ও খতিয়ান নম্বর মিলিয়ে দেখুন।
  • যৌথ খতিয়ান নাকি পৃথক খতিয়ান আগেই সিদ্ধান্ত নিন।
  • পৃথক খতিয়ান চাইলে যথাযথ বণ্টননামা সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি নিশ্চিত করুন।
  • নামজারি সম্পন্ন হওয়ার পর খতিয়ানে নাম ও হিস্যা সঠিকভাবে এসেছে কি না যাচাই করুন।
  • নামজারি হয়ে গেলেই এটিকে একমাত্র মালিকানার দলিল হিসেবে ধরে নেবেন না।

FAQ: জমির নামজারি নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন

বণ্টননামা ছাড়া কি উত্তরাধিকারসূত্রে জমির নামজারি করা যায়?

হ্যাঁ। সব ওয়ারিশের নামে যৌথভাবে নামজারি করার ক্ষেত্রে বণ্টননামা বাধ্যতামূলক নয়। ওয়ারিশ সনদের ভিত্তিতে প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করে যৌথ খতিয়ান করা যেতে পারে।

বণ্টননামা ছাড়া কি আলাদা আলাদা খতিয়ান করা যাবে?

সাধারণভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যৌথ সম্পত্তি ভাগ করে পৃথক পৃথক খতিয়ান করতে হলে বণ্টননামা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩খ ধারার ভিত্তিতে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

একজন ওয়ারিশ কি একাই পুরো জমি নিজের নামে নামজারি করতে পারবেন?

শুধু উত্তরাধিকার সূত্রে অন্য বৈধ ওয়ারিশদের বাদ দিয়ে পুরো জমি নিজের নামে নামজারি করা বৈধ পদ্ধতি নয়। উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য হিস্যা বিবেচনায় নিয়ে রেকর্ড করা উচিত।

ওয়ারিশ সনদে একজনের নাম বাদ পড়লে কী করবেন?

নামজারির আগে ওয়ারিশ সনদ সংশোধন করে প্রকৃত ওয়ারিশদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নামজারি করলে ভবিষ্যতে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে।

যৌথ খতিয়ান হলে কি প্রত্যেক ওয়ারিশের অংশ উল্লেখ থাকবে?

হ্যাঁ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির মোট জমির বিপরীতে প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করা হবে।

আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে কী করতে হবে?

সব ওয়ারিশের সম্মতিতে কে কোন দাগ বা জমির কোন অংশ ভোগ করবেন তা নির্ধারণ করে আপস বণ্টননামা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এরপর বণ্টননামার ভিত্তিতে পৃথক নামজারির আবেদন করা যাবে।


শেষ কথা

ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই স্পষ্টীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির যৌথ নামজারি করতে বণ্টননামা বাধ্যতামূলক নয়। সকল ওয়ারিশের নাম ও তাঁদের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করে যৌথ খতিয়ান করা সম্ভব।

অন্যদিকে, ওয়ারিশরা যদি সম্পত্তি ভাগ করে পৃথক পৃথক খতিয়ান এবং আলাদা ভূমি উন্নয়ন করের ব্যবস্থা করতে চান, তাহলে যথাযথ বণ্টননামা সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজন হবে।

তাই নামজারির আগে প্রথমেই ঠিক করুন আপনারা যৌথ মালিকানা হিসেবে রেকর্ড করবেন, নাকি জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করবেন। এই সিদ্ধান্তের ওপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পরবর্তী প্রক্রিয়া অনেকটাই নির্ভর করবে।

আইনি সতর্কতা: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। নির্দিষ্ট জমির মালিকানা, উত্তরাধিকার, বণ্টন বা বিরোধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, দলিল ও অন্যান্য নথি যাচাই করে ভূমি আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Reset password

Enter your email address and we will send you a link to change your password.

Get started with your account

to save your favourite homes and more

Sign up with email

Get started with your account

to save your favourite homes and more

By clicking the «SIGN UP» button you agree to the Terms of Use and Privacy Policy
Powered by Estatik
Scroll to Top